Sunday, March 13, 2016

Purulia Memoirs (1)

মাতৃ সদন। গরমকালের দুপুর। স্বপন-দা-র ঘরে হালকা আড্ডা চলছে। রেডিও-তে FM জানান দিচ্ছে বাইরের দুনিয়ার তরঙ্গ। 
রেডিও-র থেকে একটু দূরে বসে আচম্বিতে অধম-এর কর্ণকুহরে প্রবেশিল মন্দ্রস্বর - "এই রাত তোমার আমার"। আমি রেডিও-র দিকে সরে বসলাম।
স্বপন-দা-র দৃষ্টি কে এড়াবে ? "এই যে, এই যে অনুপম - এটা শোনার বয়স এখনও হয় নি - এদিকে সরে এস..."।

না: মারধোর তখন খাই নি, স্বপন-দা এটুকু বলতেই বাকিরা হাস্যরোল তুলল, স্বপন-দা-ও হাসছে। আর আমি - শোলে-র কালিয়া-র মতন - হাসব কিনা ভাবছি ।

স্বপন-দার আপাতত এইটুকু-ই । সব গল্প একদিনে বলা বা শোনা কোনটাই ঠিক নয়, রসাস্বাদনে ব্যাঘাত ঘটে । পাঠক-এরও, শ্রোতার-ও । আজ বাকি সময় বরং এখন কেমন আছি বলি ।

কয়েকদিন আগে পুরুলিয়া-র অনুজ শুভ্র-র সাথে আলাপ হলো । আমি আলাপ জমাতে বিশেষ পটু নই কোনদিন। সেই আমার বাগাড়ম্বর দেখে আমি-ই অবাক । আচ্ছা বল দেখি, শুভ্র শিবাজি প্লাটুন আর সেকশন B জানার পরেও চুপ থাকা যায়? গল্প আর গল্প-র গরু-তে আমাদের চারপাশে লোকজন তখন ভাবছে এরা কে রে ভাই, কুম্ভমেলায় হারানো সহোদর বুঝি? তা এখন বিদ্যাপীঠ-এর বাইরে এইভাবেই বিদ্যাপীঠ বুকে নিয়ে আছি ।  লাল স্কুল বলি নি কোনদিন, বিদ্যাপীঠ, পুরুলিয়া, মিশন - এইভাবে-ই কিছু একটা আমাদের জিন-র গঠন-এ ঢুকে বসে আছে। 

সত্যি কথা বলতে, এখনও তীব্র গরমে নাকাল হলে ভাবি, আরে এ আর কি এমন, গরম পড়ত পুরুলিয়াতে।  আর বাংলা ক্লাস-এর সুশান্ত দত্ত-দা ক্লাস-এ এসে-ই সব পাখা বন্ধ করার আদেশ দিতেন ।  দশ-বিশ মিনিট আকুল ঘেমে নেয়ে বলতেন এবারে চালিয়ে দে ।  তারপর বলতেন, "এবারে - আরাম বেশি কিনা?" যা: আবার গল্প-র চক্করে পড়ে গেলাম ।  যা হয় মাঝবয়সী নস্টালজিয়া-তে। পুরুলিয়া থাকে জীবনের রাজপথে, পুরনো চেনা গলিতে ।  পুজো এলে-ই অয়ি গিরি নন্দিনী ভাসে, মনে মনে আবার একবার Indian Culture-এর খাতা-য় উত্তর লিখি ।  গান-র সমর-দা-র কাছে পরীক্ষা হল-এ অতিরিক্ত পাতা চাইলে উনি এসে দিয়ে যান, ভাসিয়ে দিয়ে যান মৃদু গলা-তে, "ভারত আমার ভারতবর্ষ", ঠোঁট-এ রাঙানো পান । ক্লাস IV-এর সঙ্গীত সঞ্চয়ন আছে এখনও, উল্টে দেখি গান-গুলো ।  

আর সকাল-এ উঠতে দেরী হলে সুশীল-দা, অশোক-দা-র হুমকার শুনতে পাই ।  

রাত-এ দেরী হলে মনে হয় থার্ড বেল বাজছে । 

কাজ-কর্মে গাফিলতি করলে দেখতে পাই আমাকে, যে ধাম-এর রেডপাথ মুছে মুছে আয়না করে দেবার চেষ্টা করছে ।  জন্মাষ্টমী-র দিন, ধাম-গুলো-র মধ্যে পরিস্কার-এর প্রতিযোগিতা । অভেদানন্দ-কে জেতানোর জন্য জান লড়িয়ে দিচ্ছে সব । 

একটা স্মৃতিকথা লিখতে বসে ভাবি, কেন আবার ডাকাডাকি সেইসব দিনগুলো-কে ।  তার পরে মনে হয়, "পাপিষ্ঠ, নরাধম" বলছেন ফনী-দা ।  "৭ বছর-এর ঋণ-এ ৭ মিনিট সময় দিতে পারিস না?" ৭ বছর কেন ফনী-দা, ৭০ বছর-ই কেনা হয়ে গ্যাছে তোমাদের কাছে ।  এটা-ও কি বলতে হবে ?

কত গল্প জমে যায় । পুরুলিয়ার প্রথম দিন । মনে হয় যেন আমাদের স্মৃতি-র  হার্ড ডিস্ক ড্রাইভ-এ ওই দিন-টা যেকোনো আলঝাইমার-এর পরে-ও টিকে যাবে । কত নতুন বই, নতুন বন্ধু আর বিশালত্ব-র ছোঁয়া চারদিকে । প্রথম দিন কখন বাড়ি-র সবাই চলে গ্যাছে Z-আন্তি পারিনি, একটা-ই কারণ-এ । মাঠ । উদাত্ত অনুপ্রেরণা চারদিকে । বোধ হয় মাত্র ৭০ একর-এর মধ্যে এত পরিব্যাপ্তি পুরুলিয়া-তে-ই সম্ভব । হয়ত তখন বয়স কম ছিল । কিন্তু ঘটনা হচ্ছে তারপরে অনেক মাঠ দেখলাম, অনেক সবুজ । কি অদ্ভুত ভাবে পুরুলিয়া-তে-ই থেকে গ্যালো আমাদের ভুবন ডাঙা , মেঘলা আকাশ আর ধোপা-ফেরত সত্যি সত্যি বোতাম বিহীন ছেঁড়া শার্ট । ফুসফুস-ভরা হাসি তো ছিল-ই ।

আমাদের সময়কার শারীরবিদ্যা বলে একটা বিষয় ছিল, এখন উঠে গ্যাছে । তাতে খাতা বানাতে হত, রঙিন সেলোফেন কাগজ দিয়ে, মারাদোনা, বুরুচাগা, কপিলদেব-এর ছবি ভাসত উপরে । সেই খাতা জমা পড়ত অশোক-দা-র কাছে, উনি সব দেখে পরপর সই করছেন । যেমন খাতা তেমন সই । সিদ্ধার্থ ঘোষ-এর সযত্নে সাজানো খাতা-ই লিখলেন, "শ্রীমান অশোক কুমার ঘোষাল" । সোমক ঘোষ-এর হস্তাক্ষর তেমন ছিল না, খাতা-ও তথৈবচ । লিখলেন, "অ. ঘো." । রাত্রে খাওয়ার পর পার্থ মুখার্জী-কে ওয়ার্ডেন শ্যামল-দা কোনো কারণ-এ শাস্তি দিলেন, "নিমাই হয়ে থাক" । পার্থ হাত তুলে হাঁটু ১২০ ডিগ্রী করে দাঁড়ালো । ১০ মিনিট, ১৫ মিনিট - ফর্সা মুখ-টা বেচারা-র লাল হয়ে গ্যালো শিগগিরই । শেষে বলেই ফেলল, "স্যার, বাথরুম-এ যাব" । অগত্যা শাস্তি মুলতুবি । শাস্তি-র রকমফের-ই ছিল কত । সুশান্ত দে-দা একখানি লাঠি নিয়ে ঢুকতেন, সে লাঠি-র নাম ছিল শ্যামচাঁদ । শ্যামল-দা রেডপাথ বরাবর মুরগি-ভঙ্গি-তে কান ধরাতেন । ভোলানাথ-দা গাট্টা আর সব্যসাচী-দা রাগতেন না সচরাচর কিন্তু, রাগ করলে কি করবেন ভেবেই পেতেন না । হাত তুলেও মারতেন না, প্রায় কিছু একটা ছুঁড়ে দিয়েও ছুঁড়তেন না । নিল ডাউন, চোরকাঁটা তোলা - এই সব তো ছিল-ই । সুশীল রায়-দা বিপ্লবী জমানা-র লোক, পায়ে বুলেট-এর ক্ষত অনেকবার দেখিয়েছেন আমাদের । তিনি দেখি কোনো অজ্ঞাত  কারণ-এ একদিন ক্লাস-শুদ্ধু ছেলে-কে শীর্ষাসন করাচ্ছেন । অমিয়-দা রাগের চটে আমাকে মেরে স্কেল ভেঙ্গে ফেলেছিলেন । নতুন স্কেল, লেখা ছিল unbrekable । উঠেছিল তখন বাজারে । সেই থেকে ক্লাস-এ মারধর করলে উনি কাঠ-এর স্কেল-ই হাতে নিতেন । 

এখন দেখতে পাই স্পষ্ট, দিনগুলো রোদ্দুর ছিল একদম, ঝলমলে, সতেজ, আমরা সবাই । 

দেখতে পাই স্পষ্ট সেই calcutta ব্যাচ-এর ট্রেন, পুরুলিয়া স্টেশন-এ সমর-দা বা প্রনব-দা-র জিম্মা-য় আমরা একদল ছুটছি, আদ্রা-চক্রধরপুর রেল লাইন-র ফাঁক গলে রয়ে যাচ্ছে রুপোলি-সোনালী সময় । শুনতে পাই, হাওড়া স্টেশন-এ ঢোকার আগে আমরা উদ্দাম জোরে বলছি, We Are Blue, We Are White, We Are All Ramkrishnite... সেবার ডেনমার্ক ফুটবল টীম ইউরো জিতেছিল, আমরাও তৈরী করে নিয়েছিলাম, ওদের মতন স্লোগান । 

সবসময় হাসি থেকে যেত তা নয় । মেদিনীপুর রামকৃষ্ণ মিশন-এর কাছে হেরে গেলাম যেবার পেনাল্টি-তে, রাত্রে খেতে পারিনি । শান্তশিষ্ট সুব্রত-দা উত্তেজিত, গোলপোস্ট-এর পিছন থেকে আমাদের সমীক জোদ্দার-কে চিয়ার আপ করছেন, বলছেন "এইবার, এইবার গোল হবে-ই" । হয় নি । সবকিছু পাওয়া যায় না, সেই না পাওয়ার বেদনা চিনিয়ে দিয়েছিল কিছু অনুভূতি-কে । 

অবিশ্রান্ত বৃষ্টি-তে মুরগুমা বাঁধ ভেঙ্গে গ্যালো । কালান্তক বন্যা নিয়ে গ্যালো আমাদের অতি প্রিয় দুজন দাদা-কে। ঘটনাক্রমে সেদিন আমাদের ছুটি পড়েছিল । স্কুল খোলার পরে রোল - কল করতে গিয়ে সুশান্ত দে-দা একটা রোল নম্বর-এ এসে থমকে গ্যালেন, দুচোখ ভরে গ্যালো জলে । সেটা ছিল অঙ্কুশ-দা-র রোল নম্বর । অঙ্কুশ-দা-কে নিয়ে রামকৃষ্ণ সদন-এ একটা শোকসভা আয়োজন করা হয়েছিল । শক্তি-দা উঠে বললেন, "নিজের কেউ চলে গ্যালে কি আমরা শোকসভা করি? " চমকে উঠেছিলাম । বলছিলাম না ফনী-দা - "পুরুলিয়া-র কাছে কেনা হয়ে গেছি, সে কথা-ও কি বলতে হবে?" 

সোশ্যাল সার্ভিস ক্যাম্প-এ আমরা গেছিলাম লাউসেনবেড়া গ্রাম-এ, যেখানে বন্যা ভেঙ্গে দিয়েছিল বহু বসতি । আমরা ঘর বানাতাম, চুনকাম করতাম, আর দুপুরবেলা খেতাম খিচুড়ি । রাত্রে সদন-এ ফিরে সুশীল ঘোষ-দা-র সামনে বসে গান - "ভারতবর্ষ সূর্যের এক নাম", সুশীল-দা সেই পুরনো গল্প-টা আবার বলতেন । কিভাবে উনি পেয়াদা-কে ফাঁকি মেরে উঠে পড়েছিলেন এক ব্রিটিশ দফতর-এর মাথায়, আর নামিয়ে এনেছিলেন ইউনিয়ন জ্যাক । এক-ই গল্প । আবার শুনতাম অবাক হয়ে । 

ওই যে শুভ্র-র সাথে আলাপের কথা বলছিলাম না, গল্প আর গল্প । বরং ভাই বাদ দে, চল কদিন গিয়ে শিবানন্দ সদন-এ থেকে আসি । ইন্টার-ক্লাস ম্যাচ নিলে এখনও বলে বলে হারাবো, 4ta চিকলেট বেট ধরছি ।

যাক, মধুরেণ সমাপয়েত, একটা উটকো গল্প দিয়ে যাই । 
ক্লাস ফোর । স্বেচ্ছা-য় হাসপাতাল-এ ভর্তি হবো, কারণ সেখানে সারাদিন-এর কাজ-এ ফাঁকি ।  সে এক রহস্যময় জায়গা ।  সবাই বলেছে ভর্তি হয়ে-ই দ্যাখ, ডাবল বাটি ফিস্ট । তা চললাম একদিন, পা লেংচে লেংচে । মামা জিগ্গেস করলো, কি হয়েছে, "পায়ে ব্যথা"। ডাক্তারবাবু ছিলেন ডাক্তার দরিপা - টিপে টুপে দেখলেন, "হু হু" করে পাকা অভিনয় করলাম । admit হয়ে গেলাম ।  পরদিন দুলাল-দা সাইকেল-এ বসিয়ে নিয়ে চললেন চ্যারিটেবিল-এ, X-Ray হলো।  এদিকে আমি তখন ভাবছি কখন সদন-এ ফিরব ।  একা ভর্তি হয়েছি, ডায়েট A - অর্থাৎ খাবার-ও দিব্বি - কিন্তু মন বলছে ড্রিল, খেলা, ক্লাস সব চাই ।  লেংচে লেংচে হাঁটতে-ও বিশেষ ভালো লাগছে না ।  রাত্রে senior এক দাদা - যার পায়ে সত্যি সত্যি প্লাস্টার হয়েছিল, ডেকে অনেক গল্প করলো, লুডো খেললো ।  তবু সময় কাটে না ।  পরদিন ডাক্তার দরিপা-র ঘর-এ সোজা হেঁটে ঢুকে বললাম - "আমার পা ঠিক হয়ে গ্যাছে" ।  ডাক্তারবাবু বললেন - "হুম X-Ray-তে-ও কিছু নেই, কাল-পরশু এত ব্যথা, কি হয়েছিল বল তো ?" আমার ১০ বছর-এর বুদ্ধি-তে বললাম - "বোধয় চোরকাঁটা ফুটেছিল"।  শুনে ডাক্তারবাবু, মামা, অবনী-দা-র সে কি হাসি । এখনও বাজে কানে ।

হাসপাতাল-এ জমিয়ে থেকেছিলাম, অনেক পরে ।  সে গল্প অন্য বার । 

No comments:

Post a Comment