Sunday, March 13, 2016

Purulia Memoirs (2)

একবার ডুব দিয়েছি, এখন, কদিন ধরে-ই পুরনো লোহার পাত-এ ঢং ঢং ঘন্টা বাজছে। আমাদের ব্যাচের ঘন্টা সেবক ছিল শিবশক্তি মাহাতো, ওরফে ভজু। নিস্তার ছিল না ওর ঘন্টার ঘনঘটা-র হাত থেকে, দিনে রাতে দুপুরে, ঘন্টা ।  বিভিন্ন লয়, দ্রুতি এবং ব্যাপ্তি অনুযায়ী সেই ঘন্টা বেজে আমাদের হোস্টেল জীবন আমোদিত করে রেখেছিল ভজু ।  তা - সেই ঘন্টা বেজে চলেছে কদিন ধরে ।  একবার পুরনো প্রেম চাগাড় দিলে যা হয় আর কি, দেখেই যাই, মন ভরে না ।  কে যেন শুধু তাকিয়ে থাকে আর বলে, "এতদিন কোথায় ছিলি" ।  কত কুরু-পান্ডব ধুন্ধুমার খেলা জমে গ্যালো, কত বার কৃষ্ণচূড়া-গুলো লাল, ফিকে হয়ে ঝরে গ্যালো, ১৫ই অগাস্ট-এর মার্চ পাস্ট-এ বিবেকানন্দ রেজিমেন্ট-এর প্যারেড, সব চলে গ্যালো কুয়াসা-তে, আর তুই - আজ বছর কুড়ি বাদে এসে বলছিস, জাতিস্মর-এর মতন, "এইখানে আমরা লুকিয়ে রেখেছিলাম এক বাক্স ইন্দ্রজাল কমিক্স"।  "বলছিস - এইখানে আমার বিছানা ছিল, এইখানে রোববার সকাল-এ বাবা এসে দাঁড়িয়ে থাকত" ।  বলি - এতদিন ছিলিস কোথায় ?"   

সত্যি বড় অন্যায় হয়ে গ্যাছে ।  
"জানিস অনুপ-দা আর নেই" । 
"জানি" । 
"ফনী-দা, সুশীল ঘোষ-দা, রায়-দা, সমর চ্যাটার্জি-দা, পাঁচু-দা - কেউ না" । 
"জানি" । 

মাধ্যমিক-এর আগে অনুপ-দা, আমাদের আলাদা করে ইংলিশ দেখাতেন ।  কে একজন যেন জিগ্গেস করেছিল, "আপনি পুরুলিয়া-তে পড়ান কেন?" মানে এই গন্ডগ্রাম ।  আসলে আমরা ছোট তখন কিন্তু, বিদ্যাপীঠ-এর সিনিয়র ক্লাস ।  প্রায় বন্ধু-র মতন মিশতাম, অনেক সময় ভালো জ্বালাতন-ও করেছি, দাদা-কাকা-র সাথে যদ্দুর করা যায় ।  সেইরকম প্রশ্রয় থেকে-ই প্রশ্ন করা ।  অনুপ-দা একগাল হেসে বললেন, "তোদের জন্যই তো আছি, এমন ছাত্র আর কোথায় পাবো ?" সত্যি অনুপ-দা, তেমন শিক্ষক-ও আর পেলাম কজন? এখনও কমিটি-র ইংরাজি বানান-টা লেখা-র সময় ভাসে আপনার ঈষৎ জড়ানো উচ্চারণ-টা ।  নইলে ১০ বারে নিশ্চিত ৯ বার ভুল করতাম ।  আর মনে পরে আপনি ব্রহ্মানন্দ সদন-এর বারান্দা-তে আলিগড়ি পাজামা পরে উদাস মুখে হাঁটছেন ।  মুখে হালকা হাসি ।  যাবার আগে দেখা হলো না স্যার । 

তবে কিনা, এমন হইহই করে তখন দিন কাটিয়েছি যে, এখন বিদ্যাপীঠ-এর গল্প নিয়ে বেশিক্ষণ সিরিয়াস হতে-ই পারি না । এ তো এক আন্তর্জালিক দুনিয়া-র সামনে গল্প জমিয়েছি ।  ধরেই নিয়েছি সবাই আছে, সবাই শুনছে, সমর-দা উইংস-এর পাশ থেকে নাটক-এ তাৎক্ষণিক সঙ্গীত পরিবেশন করছেন, আর তবলা-য় কালোবরণ-দা ।  দেখা তো হবেই, এপারে নয় হেপারে । 

তবলা বলতে মনে পড়ল ।  আমরা কজন কলামন্দির-এ তবলা শিখতাম ।  কারণ সেখানে তবলা কম আর আড্ডা বেশি হত ।  তা একদিন শুভ্রাংশু গুহঠাকুরতা, কালিদাস-দা-র ছেলে, আমাদের পাপ্পু তবলা বাজাতে বসলো ।  সে কি চাঁটি ।  তবলা ফেটে যায় যায় ।  তবলা-র ঘরে-ই সব্যসাচী-দা গান শেখাতেন, তিনি দেখছেন, আমরা দেখছি । কালোবরণ-দা হাঁ হাঁ করে উঠলেন ।  বললেন "এত জোরে মারে নাকি ?" পাপ্পু বলল, "স্যার, যদি প্রোগ্রাম-এর সময় কারেন্ট চলে যায়?" কিছু বলা যায় এর পরে ?

সমর-দা, কালোবরণ-দা-কে খুব কাছ থেকে পেয়েছিলাম নাটক-এর সময়, বিদ্যাপীঠ জীবন-এর যেটা এক অপূর্ব স্মৃতি ।  

সমর-দা অবশ্য দীর্ঘদিন বিবেকানন্দ সদন-এর ওয়ার্ডেন ছিলেন ।  বকতেন না একদম-ই ।  শিল্পরসিক মানুষ, আমাদের দিয়ে দেয়াল-পত্রিকা, গাছ-এর যত্ন নেওয়া, বাগান করানো - সব উনি করতেন ।  হাতে ধরে শিখিয়েছিলেন বুড়ি-র চুল দিয়ে কিভাবে বারান্দা মুছতে হয় । সমরদা-র বাগান-এর নাইন-ও-ক্লক ঠিক ৯-টা-র সময় ফুটছে কিনা দেখতাম, পরে কৌটো-র মধ্যে মাটি পুরে রুম-এর মধ্যে-ও গাছ করেছিলাম । শিখিয়েছিলেন কিভাবে xray প্লেট ব্যবহার করে ধুলোগুলো ডাস্টবিন-এ তুলতে হয় । তপোজ্যোতি ছিল বাগান করায় ওস্তাদ, এবং সেই কারণ সমর-দা-র ডান হাত । তা সেই নির্বিবাদ সমরদা - ছেলে পুলে বিগড়ে যাচ্ছে, এমন সম্ভাবনা দেখলে খবর দিয়ে আনাতেন স্বপন-দা-কে ।  মাতৃ সদন এবং স্বপন-দা আমাদের জীবন-এ আসতে তখন ২ বছর বাকি কিন্তু, তখন থেকে-ই ফিল্ম-এর ট্রেলার-এর মতন স্বপন-দা ঘুরে যেতেন ।  আর আমরা মাঝেমধ্যে খবর পেতাম - "স্বপন-দা-র হাত-এর থাপ্পড় খেয়ে ক্লাস টেন-এর কৌশিক বর্মন-দা ছিটকে পড়েছেন - শুনেছিস ?" সে প্রায় কুম্ভকর্ণ পতন, মেঘনাদবধ-এর মতন রোমাঞ্চকর ব্যাপার ।  বিভিন্ন আকারে বিভিন্ন হোস্টেল-এ এইসব গল্প ঘুরে ফিরে বেড়াত ।  

পাঁচু-দা-কে মনে পড়ে বনমহোৎসব-এর দিন ।  আমরা ৪-৫ জন বালক মাথায় গাছের চারা নিয়ে নাচতে নাচতে যাব, "মরুবিজয়ের কেতন" ইত্যাদি বাঁধা গান চলবে ।  আমাদের রাস্তায় দেখে পাঁচু-দা একটানে নিয়ে চলে গ্যালেন উনার গ্যালারী-তে, বাউল, রাবন-বধ এইরকম অদ্ভুত সুন্দর এবং বিশাল অয়েল পেইন্টিং-এ ঠাসা ।  আমাদের কজন-এর কপালে ঝটপট টিপ পরিয়ে দিলেন সাদা রঙের, দিয়ে নিজের মনেই বললেন, "এইবার বেশ হয়েছে, যা:"।  বাদবাকি উনার আঁকা বা বলতে গ্যালে উনার পৃথিবী-তে কিসসু-ই বুঝতাম না ।  এইটা বুঝতাম যে ওই পৃথিবী-র দরজা-জানালা সবার জন্য নয় ।  তো একদিন আমার একটা ঘোর কালো বটগাছ-এর ছবি দেখে পাঁচু-দা বেশ খুশি হয়ে পড়লেন ।  সাধারনত: আমাদের ক্লাস-এর সৈকত সিনহা-র আঁকা-ই বরাদ্দ থাকত এক্সিবিশন-এ যাবে বলে । আমি আমার ছবি-র দর বাড়তে বেশ উৎসাহিত হয়ে পড়লাম ।  পাঁচু-দা বললেন, "ভালো করে শেষ কর, এটা এক্সিবিশন-এ দেব" ।  তা যা হয় আর কি, আমি আরও রং দিয়ে আরও গাড় করে ছবি-টা প্রায় ত্রিমাত্রিক করে তুললাম ।  ছবি শুকোতে কলামন্দির-এর বাইরে যেতাম, আড্ডা-ও হত, বিশেষত: সেদিন-এর বিকেলে খেলা-সংক্রান্ত ।  ছবি শুকিয়ে এদিকে রং খসে খসে গ্যালো ! আবার তাতে রং দিয়ে একটা কিছু খাড়া করে দিলাম ।  পাঁচু-দা-র নির্বাচন-এ সেটা এক্সিবিশন-এ-ও গ্যালো অবশেষে ।  কেউ কেউ বলল, "প্রায় সত্যিকার-এর গাছ, বাকল উঠে এসেছে !" সে কথাই মনে পড়ছিল, যখন আমার লেখার প্রশংসা করলেন সুশান্ত দত্ত-দা, আমাদের বাল্যবয়স-এর বাংলা স্যার ।  সেই আনন্দে এই লেখা-তে স্মৃতি-র রং উপুড় করে-ই যাচ্ছি...

অবশ্য আমি কি আর গল্প তেমন জানি, গল্প বলত দেবোপম ভট্টাচার্য ।  ক্লাস-এ কোনো কারণ-এ স্যার না এলে, দেবোপম-এর গল্প ছিল বিশেষ আকর্ষণ ।  এবং ক্রমশ: প্রকাশ্য-র মতন দেবোপম-এর গল্প বহু ক্লাস ধরে চলত ।  মাধ্যমিক-এর পর লেক গার্ডেন্স-এর কাছে একদিন দেখি দেবোপম, ওকে ঘিরে ৪-৫ জন তরুণী ।  যথারীতি ও গল্প বলছে ।  বাকিরা অবাক হয়ে শুনছে ।

দেবোপমের ধারাবাহিক গল্প-র মাঝে কোনো কোনো দিন আবার জমিয়ে রাখত শিলাদিত্য অথবা বেনুধর, সুব্রত-দা-র ছেলে ।  দুজনে-ই পাক্কা অভিনেতা ।  পর পর চলত স্যার-দের নকল ।  সেইদিন-ও চলছে নকল, ঢুকলেন প্রনব-দা ।  একদম বিনা নোটিস-এ, আচমকা ।  ক্লাস-এ পিন পড়লে তখন আওয়াজ হবে ।  বেনুধর মহাস্থবির-এর মতন দাঁড়িয়ে, মার-ধোর শুধু শুরু হবার অপেক্ষা ।  আমাদের অবাক করে প্রনব-দা বললেন, "যা চলছিল, চলুক" ।  বেনুধর পারলে তখন পাতালপ্রবেশ করে, কিন্তু প্রনব-দা নাচার ।  সুরু হলো । অসিত-দা-র নকল, সুশীল-দা-র নকল ।  এবারে প্রনব-দা-র বিশেষ দাবি-তে উনার-ই নকল ।  অগত্যা তাই হলো ।  সেই দেখে প্রনব-দা তো ক্লাস কাঁপিয়ে হাসলেন ।  ব্যাস, শিলাদিত্য-ও শুরু হয়ে গ্যালো ।  জমজমাট ক্লাস । 

সেই শিলাদিত্য শান্তিপ্রিয় পাঁচু-দা-কে একবার খেপিয়ে দিয়েছিল কিভাবে ।  এন্তার চড়-থাপ্পড় খেলো ।  ১০-১৫ মিনিট পরে আমরা আবহাওয়া বোঝার জন্য পাঁচু-দা-র গ্যালারী-তে উঁকি মারলাম ।  দেখি পাঁচু-দা বিশাল ক্যানভাস-এ আঁকছেন, আর পাশে রং-তুলি-জল-এর সরঞ্জাম নিয়ে শিলাদিত্য একমনে ছবি আঁকা দেখছে । সম্প্রতি একদিন পাঁচু-দা মারা যাবার খবর পাবার পরে দেখি, ফেইসবুক-এ উনার একটা প্রোফাইল, তাতে অপূর্ব সুন্দর সব পেইন্টিং-এর ছবি ।  বিক্রি-র জন্য কেউ দিয়েছে ।  

আমাদের ব্যাচ-এর দেবদূত এখন কাছাকাছি-ই থাকে । এবং হুসেন, রাজা এদের ধাঁচে দুর্ধর্ষ পেইন্টিং করে । ওকে অবাক হয়ে জিগ্যেস করলাম, "তুই তো স্কুল-এ খুব ভালো ছবি আঁকতিস বলে মনে পড়ে না, তা শিখলি কোথায় ?" ও বলল, "কোথায় আর শিখব, নেট-এর থেকে পড়ে রপ্ত করলাম, আর বেসিক-টা তো সেই পাঁচু-দা-র কাছেই শেখা" । মনে পড়ে গেল, সেই কপালে একটা ছোট্ট টিপ । ব্যাস ঐটুকু-তে-ই চলছে আমাদের । কে বলল পাঁচু-দা নেই ?

1 comment:

  1. শিবশক্তি শুনেছি এক বড়সড় দাদা ব্যক্তিত্য| এর বেশি জানি না| লেখাটা পড়ে ২২-২৫ বছর পিছিয়ে গেলাম; দেখলাম আমাদের বিদ্যাপীঠ সেই একইরকম আছে| চালিয়ে যা, সঙ্গে আছি|

    ReplyDelete