Sunday, June 12, 2016

Purulia Memoirs (3)

পুরুলিয়া-র একটা বিশেষ পর্ব ছিল স্টক। এমনিতে কিছু না, বাড়ি থেকে মাঝে মধ্যে গেস্ট এসে স্টক দিয়ে যেত। একটু ঘেঁটে গ্যালেন কি? খুলে-ই বলি। আমরা বাবা-কাকা-পিসে-ঠাকুমা-দিদি সবাই-কে-ই গেস্ট বলতাম। প্রথম দিন ছেড়ে চলে যাবার পারে বাবা যখন আবার দেখা করতে এলো, কে যেন এসে বলল - "তোর গেস্ট এসেছে"। কিসের কি না বুঝেই বাইরে এলাম। শিবানন্দ সদন-এর লৌহদ্বার-এ খাঁদু-দা, পার হয়ে দেখি বাবা এসেছে। বুঝলাম, বাবা এখানে গেস্ট। মা চিঠি পাঠিয়েছে, হাত-চিঠি, আর প্রচুর খাবার। শুকনো, যেগুলো নষ্ট হবে না। বিস্কুট, চানাচুর জাতীয়। সেই খাবার হলো স্টক। স্টক-এর গল্প-র স্টক - আমি নিশ্চিত - আমাদের কারও কম নেই। আমি ২-৫-টে বলি। 

স্টক থাকত খাট-এর নিচে বালতি-তে, কখনো সেল্ফ-এ-ও থাকত। মৌচাক-এর মৌতাত পাওয়া ভালুকছানা-র মতন আমরা সবাই সদ্য স্টক-প্রাপ্ত নটবর-কে ঘিরে ধরতাম। একটু টেস্ট করতে দিবি রে? - এই ভাবে শুরু হত। সিনিয়র দাদা হলে তো কথা-ই নেই। ভেট-এর মতন স্টক চড়ে যেত । আর জেট-এর মতন উড়ে যেত। স্টক শুধু যে বাড়ি থেকে-ই আসতো তা নয় অবিশ্যি । বিভিন্ন সোর্স ছিল। হয়তো ভাঁড়ার ঘর-এর সমু-দা কিম্বা যুধিষ্ঠির-দা পেয়ারা দিল খান-কতক। অরিত্র প্রধান-কে বিবেক মন্দির-এর সত্য-দা বিশেষ স্নেহ করত - আমরা বলতাম লোকাল গার্জেন - কিছু এনে দিল খাবার। আর আমাদের স্টোর তো ছিল-ই ডেয়ারী মিল্ক, জেমস ইত্যাদি-র জন্য। মোটামুটি কার কবে কি স্টক আসবে এবং সেইসব-এর মধ্যে কোন স্টক লোভনীয় - তার একটা খাদ্যমানচিত্র আমাদের মধ্যে জ্বলজ্বল করত । যেমন - সৌরিব্রত কাঁচা গাজর এবং প্রটিনেক্স খেত। সেখানে কোনদিন ভুলেও সেদিকে গেছি বলে মনে পড়ে না। অন্যদিকে সোমনাথ বিভিন্ন কিসিম-এর আচার খেত - এবং খাওয়াত ।

ঘি এবং আচার-এর মহিমা ছিল অন্যরকম । ডাইনিং হল-এ যে ঘি-আচার-এর শিশি নিয়ে ঢুকত, তার কপাল-এ সেসব বেশিদিন থাকত না, বিশেষ করে লাজুক ছেলে হলে। লম্বা ডাইনিং হল-এর একপ্রান্ত থেকে আরেকপ্রান্ত সেইসব শিশি-রা সৌরভ ছড়িয়ে বেড়াত। আরেকটু ওস্তাদ ছেলে হলে, ওই ঘি-আচার-এর বিনিময়-এ কিছু শর্ত রেখে দিত - বিকেলে ব্যাটিং, গল্প-বই ধার দেওয়া - এইসব। তবে, ওস্তাদ-দের-ও ওস্তাদ থাকে। তারা ডাইনিং হল-এ একটা চামচ নিয়ে ঢুকত, চামচ-এ শুধু তার নিজস্ব অল্প আচার। ব্যাস। তাদের থেকে সেসব বাগাতে হলে অনেক আগে তাদের কাছে চামচ নিয়ে গিয়ে ধর্ণা দিতে হতো। অল্পবয়স-এ অনেক খাবার-এর স্বাদ-ই অচেনা, তাই মুখরোচক লাগত বেশ। মনে আছে পার্থ গ্লুকোন সি খাইয়ে আমাদের তাক লাগিয়ে দিল একবার । কিছুদিন সেটা-ই ছিল আমাদের মটন বিরিয়ানি। বাড়ি-তে চিঠি দিলাম, গ্লুকন সি পাঠিও । বোধহয় গেস্ট-দের-ও তাক লেগেছিল আমাদের গণহার-এ স্বাস্থ্য সচেতনতা বৃদ্ধি-তে। বাঁকুড়া থেকে অনুনয় শেঠ ছিল আমাদের পটেটো চিপস-এর সোর্স। ওকে অনেকখন পটালে একটা দুটো পটেটো পাওয়া যেত। তখনো বাজারে পাইকারী হারে আলুভাজা-র অনুপ্রবেশ ঘটেনি। প্রাক-মনমোহন সিংহ জামানা। একদিন প্রথম খেয়ে কর্নফ্লেক্স জিনিস-টা-ও বেশ অন্যরকম লাগলো। সেই চলল কিছুদিন। অরিত্র-র কাছে মজুত থাকত কর্নফ্লেক্স একগাদা। বাটি নিয়ে চড়াও হতাম।

স্টক-এর বিশেষ প্রয়োজন দেখা দিত এক্সকার্সন-এর সময়। সুধন্য-দা-র বাস-এ করে কল্যানেশ্বরী, বিষ্ণুপুর যেতে যেতে বুরবন বিস্কুট খাচ্ছি, এইরকম একটা সুখস্বপ্ন নিয়ে বেশ আগে থেকে প্রস্তুতি চলত। দল পাকিয়ে ফেলতাম, ৪-৫-জন-এর। সেই দল-এর মধ্যে খাবার ভাগাভাগি করে কিনে নিতাম আর যেতে যেতে ভাগাভাগি করে খাওয়া। বহু বছর পর প্রথম বাইরে পড়তে গিয়ে যখন যুথবদ্ধ ভাবে থাকতাম, এই ভাগাভাগি ব্যাপার-টা আমাকেই সামলাতে হত। সব সেই কালের ট্রেনিং। সাধে কি আর পুরুলিয়া-র ছেলেগুলো চারদিকে লাল দেখে?

পুরো ৭ বছর ধরে স্টক নিয়ে এই মোহ থাকেনি । হোস্টেল-এর খাবার একসময় রুচে গ্যালো দিব্বি; ঘ্যাঁট অমৃত সমান হয়ে দেখা দিল। আচার-এর ব্যাপার-টা ছিল। কিন্তু ক্লাস ৭-৮-এর পরে বাড়ি-তে চিঠি লিখে বিশেষ স্টক আনতে বলেছি বলে মনে পড়ে না। তবু সেই ব্যাচ-এর মধ্যে আচার-এর চামচ-এর যেটুকু চোনা ছিল, সেটুকু-ও ভেসে গ্যালো মাতৃ সদন-এ গিয়ে । নিজস্ব স্টাইলে স্বপন-দা বুঝিয়ে দিলেন যে স্টক-এ অধিকার সবার। কিন্তু, বিশেষ অধিকার গেস্ট-দের। এই গেস্ট হলো মাতৃ সদন-এর গেস্ট। মানে সত্যিকার গেস্ট - যেমন, বুধু-দা, স্টাডি-তে পড়াতে আসা স্যার-রা। সেই সুবাদ-এ খাঁটি সোভিয়েত দেশ-এর মতন সব স্টক বাজেয়াপ্ত হত আসামাত্রই । আর চলে যেত রুম নম্বর ২-র সমীর-এর জিম্মা-তে। ও ছিল স্টক-এর পাহারাদার এবং গেস্ট-দের হোস্ট । তা সেই সমীর একদিন দেখি একটা বড় আঙ্গুর-এর ডাল নিয়ে বিছানা-তে হেলান দিয়ে একটা একটা করে খাচ্ছে। স্বপন-দা ত্রিসীমানা-তে নেই। আমাকে দেখে একগাল হেসে বসতে বলল। দিয়ে টুপ করে একটা আঙ্গুর নিজের মুখে ফেলে বলল - "আমি সম্রাট সাহজাহান হয়েছি!"

আজ-ও অলস দুপুর-এ বালিশ-এ ঠেসান দিয়ে খেলে মনে হয়, সেই কথা। সামান্য আঙ্গুর, আর আমি সম্রাট সাহজাহান।

2 comments:

  1. Awesome. Mone pore jache arekjoner kotha. ARIJIT MUKHERJEE. Sunday holei or room e hana deoa compulsory chilo. Local chele chilo, tai every weekend kaku and kalima kaaju and kismis er chota packet asto, next 6 days er jonno. Kintu I doubt, konodin segulo week thakto kina... :)

    ReplyDelete