Monday, June 27, 2016

Purulia Memoirs (4)

অভেদানন্দ ধাম-এর ধামসেবক ছিল পিনাকী-দা, আমার পাশের বেড-এই থাকত। খুব সম্ভবত: আমাদের ভর্তি-র কদিন বাদে-ই ২৩শে বা ২৬শে জানুয়ারী-তে পিনাকি-দা আমাকে জানালো রাত্রে সিনেমা দেখানো হবে। সিনেমা ব্যাপার-টা ঠিক কিরকম অনুভূতি নিয়ে আসত, সেটা বিভিন্ন প্রজন্ম বিভিন্ন মতামত দেবে। আমরা, যারা ৮০-৯০ দশক-এ বড় হয়েছিলাম, তাদের অনেকের কাছে সিনেমা তখনো একটা নিষিদ্ধ গন্ধ মাখা ছিল । বাবা-মা-র সাথে বড় জোর হাতি মেরে সাথী কিম্বা Born Free অব্দি ছিল আমাদের দৌড় । মনে পড়ে একবার দুরদর্শন-এ কর্ণার্জুন দেখানো হবে বলে সকাল থেকে অপেক্ষা করেছিলাম । হল-এ গিয়ে সিনেমা দেখা আর আজকের যুগ-এ box-এ বসে live লা লিগা-র ফাইনাল খেলা দেখা বোধয় এক-ই রকম রোমাঞ্চকর ছিল । অতএব, পিনাকী-দা-র কথায় বেশ টেনে গেলাম, মানে সারাদিন টানটান হয়ে থাকলাম আর কি ! 

সন্ধেবেলা ভজন-এর পর আমরা লাইন করে শিবানন্দ সদন থেকে হন্টন দিলাম অডিটোরিয়াম-এর উদ্দেশে । সেখানে ৪-৫-৬ ক্লাস-এর ছাত্র-রা দোতলা-তে বসে সিনেমা দেখত । যারা ধামসেবক, যেমন পিনাকী-দা, তারা বসত একদম সামনের সিট-গুলো-তে, অথবা পাখা-র পাশে। পাখা-র কাছের সিটগুলো-র বিশেষ আকর্ষণ ছিল সঙ্গত কারণ-এই । পুরুলিয়া-তে থাকতে ৪৭ ডিগ্রী অব্দি দেখেছি, আর রুম-এ পাখা থাকত না। স্বাভাবিক প্রবৃত্তি-র মতন-ই পাখা থাকলেই আমরা সেদিকে চলে যেতাম। পাখার পাশেই জায়গা পেয়ে গেছিলাম কারণ, বেশ মনে আছে যে সিনেমা-র কিছুই মনে নেই। ছোটবেলা-র অসংখ্য জিনিস-এর মতন, উত্তেজনা-র আনন্দ-ই সবথেকে বড় প্রাপ্তি। শেষ অব্দি সিনেমা দেখার আগেই হাওয়ার আমেজে ঘুমিয়ে গেছিলাম। যখন শেষ হলো সবাই ধাক্কা মেরে তুলেছিল। অতএব, কি সিনেমা দেখেছিলাম মনে নেই। এটুকু শুধু মনে আছে, আমাদের সাদা-কালো কলেক্শন-এর-ই একটা সিনেমা ছিল। সেই সময়কার স্কুল-এর তুলনা-যে আমি নিশ্চিত পুরুলিয়া বেশ আধুনিক ছিল। বড় সাদা স্ক্রিন-এ প্রজেক্টের থেকে সিনেমা দেখানো হতো। কলেক্শন-এর সিনেমা ছিল বেশ কিছু - পৌরাণিক, দেশাত্মবোধক, কিশোর-দের জন্য। সেগুলো-ই ঘুরিয়ে ফিরিয়ে দেখানো হতো। পুরোনো হয়ে যেত, বার বার হয়তো এক-ই সিনেমা দেখতাম। তাও উৎসাহ কমতো না। যেমন সুভাষচন্দ্র বোস কিংবা শহীদ ক্ষুদিরাম সাত বছরে অন্তত সাত বার দেখেছি - 15ই আগস্ট আর 26 শে জানুয়ারি - এগুলো ছিল বাঁধা। তাহলে-ও স্টাডি হল-এ না গিয়ে অন্ধকার হল-এ বসে সিনেমা দেখার প্রাপ্তি অন্যরকম ছিল। এর মাঝে ভিন্ন স্বাদ এনে দিতো - হয়তো একদিন 1983-র লর্ডস-এর ফাইনাল-এর পুরোনো ফিল্ম দেখা বা জয় জয়ন্তী-র মতন সিনেমা। 

ক্লাস 5-এ পড়তে হঠাৎ আমাদের সাদাকালো জীবনটা বেশ রঙ্গীন হয়ে উঠলো কিছু মহারাজ-এর সিদ্ধান্তে। আমরা বাচ্চা বটে, তা বলে বোধ-বুদ্ধি তো চিরকাল আর শৈশব-এর তরণীসেন বধ-এ আটকে থাকে না। বিশেষত পৌরাণিক সিনেমার রম্ভা-উর্বশী-দের আকছার-ই দেখছি। অতএব, চালু হলো রঙ্গীন সিনেমা। তবে বিপ্লব শুরু হতেই বড় পর্দায় দেখা দিলো না, এলো ভিডিও ক্যাসেট-এর হাত ধরে। ভিডিও ক্যাসেট নামক মধুর খোঁজ বোধয় আজকের চপলমতি বালকরা পায় নি। দিন ছিল বটে সেইসব। পাড়া-র ছোট্ট দোকানে ঠাসা লাইব্রেরি-র বই-এর মতন তাকে তাকে ভর্তি মিঠুন, ধর্মেন্দ্র তখন রাজ করছে। বিরাট কাট-আউট নিয়ে কলকাতা শহরে আধুনিক সময়-এ জেগে উঠছে মন্দাকিনী আর রাম তেরি গঙ্গা মৈলি। সেই রকম সময় একদিন শুনলাম আমাদের মাসুম দেখানো হবে। রীতিমতন বড়-দের সিনেমা, তদুপরি হিন্দি - যেটা তখনো বিশেষ বুঝতাম না। ফলত: সিনেমা-টা পানসে লাগলো। শুধু সিনেমা-র পরেও মানস গুপ্ত আর শিলাদিত্য আমাদের মাসুম-এর গান-এ মাতিয়ে রেখেছিলো। গুলজার-এর নাম তখনি প্রথম শোনা। সেই কর্ণেন্দ্রিয় দিয়ে-ই ঢুকতে শুরু করলো অকালপক্কতা, মাসুমিয়াত আর রইলো না বেশিদিন। অরিত্র প্রধান সেবক ছিল, সেই কিনা বৃষ্টি-র দিন স্যার ক্লাস-এ না এলে, গেয়ে দিলো - "বোম্বে থেকে চেপেছি গীতাঞ্জলি-তে" - সেটা আবার কোনোভাবে ফাঁস হয়ে-ও গ্যালো। বেশ কড়াকড়ি চলল কিছুদিন। রঙ্গীন সিনেমা-র অনুপ্রবেশ অবশ্য থামলো না। খুব শিগগিরই দেখানো হলো ব্রুস লী-র দ্য বিগ বস। মনে আছে, সিনেমা-র একটি বিশেষ দৃশ্য-র আগে আমাদের সম্পূর্ণ বখে যাওয়া থেকে বাঁচাতে একজন দাদা, মহারাজ-এর নির্দেশে ফাস্ট ফরওয়ার্ড করে দিলো সেখানে । পহেলাজ নিহালনি কেস আর কি ! চলছিল বেশ, ধিকি ধিকি অপসংস্কৃতি-র আগুন। 

আগুন-এ জল ঢেলে দিয়ে গ্যালো এক সাদাকালো সিনেমা। 

এবারেও টিভি, এবারেও ভিডিও ক্যাসেট। দেখানো হবে উত্তমকুমার-এর সবার উপরে। আমরা ৮০-৯০-এর প্রজন্ম, তখনো উত্তমকুমার বলতে বিশেষ কিছু বুঝতাম না। বাংলা সিনেমা বলতে গুগাবাবা, সোনার কেল্লা - এগুলো-ই বেশি টানতো। যাক, দেখা গ্যালো সবার উপরে - ছবি বিশ্বাস-এর হাহাকার, সন্ধ্যা মুখোপাধ্যায়-এর গান - মোটামুটি লাগলো । একটিও ঝাড়পিট নেই তো - ভালো লাগার কথাও নয়! বাজ পড়লো কদিন বাদে। সান্ধ্য ভজন-এর পরে বিমল মহারাজ জিজ্ঞেস করলেন, "সবার উপরে" বলতে আমরা কি বুঝেছি । এতো-টা সিরিয়াসলি সিনেমা দেখতে হবে ভাবিনি, সেই পাঠ্য শেষ-এ আলোচনা গোছের অবস্থা। আমরা ভাবছি, ভেবে-ই চলেছি। অধৈর্য্য হয়ে-ই বোধহয় একটু - বিমল মহারাজ প্রাঞ্জল করে দিলেন। "সবার উপরে হচ্ছে সত্য" - এটা-ই হচ্ছে সিনেমা-টার বক্তব্য। আমরা বিলক্ষণ ঘাড় নেড়ে সম্মতি জানালাম । তার পর বিমল মহারাজ জানালেন, কোনো এক গার্জেন নাকি উপরমহলে কমপ্লেন ঠুকেছেন, তরলমতি বালক-দের উত্তম-সুচিত্রা-র সিনেমা দেখিয়ে পাকিয়ে দেওয়া হচ্ছে। বোঝো কাণ্ড! 

যা হবার তাই হলো । বিগ বস থেকে আমরা ফিরে গেলাম পান্ডব-দের অজ্ঞাতবাস-এ । 

তাবলে হোস্টেল-এর বাইরের জীবন তো থেমে থাকে না। ক্লাস সেভেন-এ উঠতে-ই আমাদের সদন থেকে কেউ একজন ভাসিয়ে দিলো "ওয়ে ওয়ে"-র সুর। সেই পর্ব চললো, ক্লাস এইট-এ-ও। গান-এর লড়াই, সিনেমা-র চিত্রনাট্য এবং নায়ক-এর টেরি নিয়ে কেটে যেতে লাগলো রোববার-এর ধাম-স্টাডি-র অলস দুপুরগুলো। সিনেমা-র পোকা ছিলাম বলে হিপ জনতা-র মধ্যে আমার বিশেষ কদর-ও ছিল। সাদাকালো-র বাদশা থেকে একত্রে উত্তীর্ণ হয়ে গেছিলাম বেনাম বাদশা পর্যন্ত। ব্রহ্মানন্দ সদন-এর সমর-দা, তাপস-দা - আমাদের আরো অনেক উপদ্রব-এর মধ্যে এটা-কে-ও বিশেষ ছাড় দিয়ে রেখে দিয়েছিলেন । আমরা ছিলাম আমাদের মতন । এমনকি অমিতাভ বচ্চন-কে লেখা ফ্যান মেল চলে গেছিলো ঠিক ঠিকানা-তে, ফেরত চিঠি এসেছিলো বাড়ি-তে। ভাগ্গিস সব গার্জেন "সবার উপরে" অকারণ শৈশব চাপিয়ে দিতেন না। 

মাতৃ সদন-এ অবশ্য সিনেমা-ফিনেমা ডক-এ উঠেছিল সিলেবাস-এর বিভীষিকা-য়। টুকটাক রোজা, ডর - ঢুকছিল ঠিক-ই কিন্তু, জীবন ঘুরপাক খাচ্ছিলো কেশব চন্দ্র নাগ আর ABTA টেস্ট পেপার-এর আবর্তে। এমনকি যখন বার্ষিক ক্রীড়া অনুষ্ঠান-এ মনোহর আইচ এলেন, শুনলাম উনি দুহাত-এ টেনে টেস্ট পেপার ছিঁড়ে ফেলতে পারেন । যে সময় মানুষ যা ভাবে ! তা ছাড়া মাতৃ সদন-এ স্বপন-দার তড়িৎচুম্বকীয় ক্ষেত্রে-র মধ্যে সানি দেওল-ও টলটল করতো, আমরা আর কি এমন! শুধু একদিন আড্ডা-র মধ্যে স্বপন-দা বলেছিলেন, উত্তমকুমার-এর স্ত্রী দেখতে গিয়ে উনার নরেন্দ্রপুর থেকে পালানো এবং ধরা পড়ে যাবার গল্প। সে অবশ্য শেষ-এর দিকের কথা, বন্ধু-র মতন হয়ে গিয়েছিলেন ততদিন-এ, প্রচুর মারদাঙ্গা-র পরে। জঞ্জীর-এর অমিতাভ-প্রাণ-এর মতন আর কি! সেই সময় আমরা আউটগোইং ব্যাচ। অডিটোরিয়াম-এ বসতাম একদম সামনের সিট-এ। বিস্মিত কচিকাঁচা-রা দেখতাম দোতলা ভরিয়ে ফেলছে হুড়মুড়িয়ে। পাখা-র পাশে বসার জন্য তর্কাতর্কি - সেই ট্রাডিশন সমানে চলেছে। 

গত বছর রিউনিয়ন-এ গিয়ে অডিটোরিয়াম-এর প্রোজেক্শন রুম-এ ঢুকে পড়েছিলাম কজন মিলে। ক্যানবন্দি সারি সারি ফিল্ম, আমাদের শৈশব, বাল্য, কৈশোর ধুলো মেখে পড়ে আছে। ভাবছিলাম, আজকের ১৪০০ কেবল চ্যানেল-এর যুগের কদিন আগেই ১৪-টা সিনেমা-যে ৭ বছর কিভাবে কেটে গেছিলো। উত্তর-টা অবশ্য খুব সোজা। 

পুরুলিয়া-র জীবন-টা একটা সিনেমা-র মতন-ই ছিল। এতো টানটান চিত্রনাট্য কোনো তার্কভস্কি-ও লিখতে পারবে না।

No comments:

Post a Comment